সিলেটি,বাংলা নয়
সিলেটি বাংলা নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা, যার নিজস্ব ব্যাকরণ, ধ্বনি, শব্দভাণ্ডার এবং লিপি রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সিলেটি তার মৌখিক ঐতিহ্য এবং নিজস্ব লিপি ছিলোটি নাগরি নিয়ে টিকে আছে। সিলেটিকে বাংলার উপভাষা বলা কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক সত্য নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যা সিলেটিদের পরিচয়কে অস্বীকার করে এবং ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করে।
পৃথিবীর উদাহরণগুলো সত্যকে স্পষ্ট করে। ফরাসি ও ইতালীয় উভয়ই লাতিন থেকে এসেছে, তবুও প্রতিটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ আংশিকভাবে একে অপরের ভাষা বোঝা যায়, কিন্তু কোনোটিকেই উপভাষা বলা হয় না। হিন্দি ও উর্দুও ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডার প্রায় একই, তবুও উভয়ই স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ইংরেজি প্রায় অর্ধেক শব্দ ফরাসি থেকে নিয়েছে, কিন্তু ইংরেজিকে কখনো ফরাসির শাখা বলা হয়নি। মাল্টিজ ভাষার বক্তা মাত্র পাঁচ লক্ষ, তবুও এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি ভাষা হিসেবে সুরক্ষিত ।
আরও কাছাকাছি উদাহরণ হলো অসমীয়া ও বাংলা। দুটি ভাষাই ইস্টার্ন নাগরি লিপি ব্যবহার করে এবং হাজার হাজার সাধারণ শব্দ ভাগাভাগি করে। তবুও অসমীয়া একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছে। সিলেটি তার চেয়েও এগিয়ে, কারণ এর রয়েছে নিজস্ব প্রাচীন লিপি ছিলোটি নাগরি, আর এর ব্যাকরণ ও ধ্বনিতন্ত্র বাংলার থেকে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। যখন অসমীয়া স্বীকৃতি পায়, তখন সিলেটিকে উপভাষা বলা স্পষ্ট দ্বিচারিতা। ভাষাবিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের প্রতিটি মানদণ্ডে সিলেটি বাংলা নয়।
সংস্কৃতিতেও সিলেটির স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট। সিলেটি খাবার, আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব কোনোভাবেই বাংলা নয়। সিলেটের নিজস্ব ফল হাটকোরা বাংলা নয়, বিবাহের রীতি মাসকাটা বাংলা নয়। সিলেটি গান, কবিতা ও নাচের সুর, ছন্দ এবং আবেগ সম্পূর্ণ আলাদা। এই সংস্কৃতি সিলেটির, এটি বাংলা ঐতিহ্যের অংশ নয়।
পরিচয়ও একই কথা প্রমাণ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সিলেটিরা বাইরের মানুষকে “বেঙ্গলি” বা “আবাদি” বলেছে, যার অর্থ অভিবাসী। সিলেটের অর্ধেক অংশ ভারতের বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরায় পড়ে, তবুও সেখানকার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি একই। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি আসলে সিলেটি। লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক, টরন্টো পর্যন্ত সিলেটিরা একই ভাষায় কথা বলে এবং একই পরিচয় বহন করে। এভাবেই সিলেটিরা একটি জাতি—দেশ নয়, কিন্তু ভাষা ও ঐতিহ্যে বাঁধা একটি জাতিসত্তা।
তবুও আজ সিলেটি গুরুতর সংকটে। বাংলাদেশে স্কুলে সিলেটি বললে শিশুদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। পরিবারগুলো সামাজিক লজ্জার ভয়ে তাদেরকে এটি আড়াল করতে বলেছে। গত দুই দশকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে নিজেদের ভাষাকে লজ্জার বিষয় ভেবে। কথ্য রূপ ক্রমশ বাংলাকৃত হচ্ছে এবং খুব কম মানুষই ছিলোটি নাগরিতে পড়তে বা লিখতে পারে। একসময়ের সমৃদ্ধ ভাষা আজ শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার পথে।
সিলেটিকে রক্ষার আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। এই ভয় দেখানো বহু বছর ধরে সিলেটিদের চুপ করানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু একটি ভাষার স্বীকৃতি চাওয়া বিভাজন নয়, এটি মর্যাদা। মাতৃভাষায় শিক্ষা চাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটি ন্যায়বিচার। ছিলোটি নাগরিকে টিকিয়ে রাখা বিদ্রোহ নয়, এটি দায়িত্ব।
সিলেটিকে রক্ষার আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। এই ভয় দেখানো বহু বছর ধরে সিলেটিদের চুপ করানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু একটি ভাষার স্বীকৃতি চাওয়া বিভাজন নয়, এটি মর্যাদা। মাতৃভাষায় শিক্ষা চাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটি ন্যায়বিচার। ছিলোটি নাগরিকে টিকিয়ে রাখা বিদ্রোহ নয়, এটি দায়িত্ব।
সিলেটি হলো সিলেটি। সিলেটি বাংলা নয়।
